দু’টি ক্ষুদে গল্প (দুর্বলতা)

ঘটনা-১

সে অনেকদিন আগের কথা, যে সময়টার কথা লিখছি সেটা অন্ততপক্ষে

১৬ কিংবা ১৭ বৎসর পূর্বেকার ঘটনা।

দুর্গাপূজা উপলক্ষে বিশাল এক মেলা বসতো আমাদের বাড়ির ঠিক পাশেই।

সবেমাত্র অন্তরীক্ষটায় মসৃণ একটা হলুদাভ রঙের সঞ্চার হয়েছে বটে, তবে সেটার ডেনসিটি বেখাপ্পা রকমের পুরু নয়।

সন্ধ্যার লগ্ন পেরুবার বেশ আগেই ছোট বোনকে নিয়ে  অনাকাঙ্ক্ষিত উপদ্রবের ন্যায় সেই মেলায় আবির্ভূত হলাম, কিন্তু তখন কি আর জানতে পেরেছিলাম কী এক বিভীষিকাময় সময় অপেক্ষা করছে আমার জন্য..!!

 

যাইহোক,

ছোট বোনটিকে মেলার প্রবেশপথের ঠিক বিপরীত পার্শ্বে শোভনীয় দূরত্বে দাঁড়িয়ে রেখে আমি মেলায় ঢুকলাম ওর জন্য কিছু খাবার কেনার উদ্দেশ্যে।

ঝালমুড়ি, চীনাবাদাম আর অজ্ঞাত কিছু একটা কিনে রওনা দিয়েছি মাত্র, আকস্মিক অকথ্য নোংরা ভাষায় একটা বিশ্রী গালির শব্দ কর্ণপাত হতেই স্তম্ভিতের ন্যায় থমকে দাঁড়ালাম তথাস্থানেই, অবিলম্বেই বুঝলাম অশালীন শব্দটা আমার উদ্দেশ্যেই নিক্ষেপ করা হয়েছে….।

 

১৬/১৭ বছর বয়স হবে ছেলেটার, কিঞ্চিৎ বেঁটে তবে বেশ শক্তপোক্ত শরীর, গায়ের রঙ তেলচিটে কালো।

পক্ষান্তরে, আমার আর কী বয়স তখন, ১১/১২ বছর হবে হয়তো, ছিপছিপে গড়নের তালপাতার সেপাই।

আজন্ম আরামপ্রিয় ও অলসতায় অভ্যস্ত শরীর খুব শক্তপোক্ত হওয়া সত্যিই দুরাশা।

 

আমি দাঁড়িয়ে পড়তেই ছেলেটি আমার সম্মুখে চলে এলো আরো গোটাকত গালি ছুড়তে ছুড়তে, আকস্মিকতার ঘোর তখনও কাটেনি আমার।

সংবিৎ ফিরে পেয়েই জিজ্ঞাসা করলাম “ভাই কী হইছে? কেন এভাবে গালি দিচ্ছেন?”

উত্তরে আরেকটি নির্ভেজাল মৌলিক গালি দিয়ে বাজখাঁই গলায় বললো “চোখ কি পকেটে নিয়া হাটিস নাকি? চোখে দেখিস না..??”

ততোক্ষণে তার সাথে ছোট বড় মিলিয়ে আরো ৪ জন সহযোগী যুক্ত হয়েছে, এবার ওরা ৫ জন।

আমি যথাসাধ্য ক্ষোভটা দমন করে মার্জিতভাবে বললাম “কখন আপনার পায়ে পাড়া দিয়েছি দেখিনাই ভাই, তাছাড়া মেলার এই অস্বাভাবিক ভীড়ের মাঝে অসতর্কতাবশত পায়ে পাড়া লেগে যেতেই পারে, এটা খুব বেশি দোষের নয়, তবুও আমি দুঃখিত।”

 

মিষ্টি কথায় চিড়া মুড়ি ভিজলেও আমার এসব কথায় কিঞ্চিৎসমও কাজ হলো না, তাদের একটাই প্রশ্ন কেন পায়ে পাড়া দিলাম, এই অপরাধের ক্ষমা নেই যেন!

আচ্ছা গোয়ার তো..!!

বয়স কম, রক্ত প্রচুর গরম, তবুও নিজের আক্রোশ বহুকষ্টে চাপিয়ে রাখলাম যথাসাধ্য।

কেননা বয়সে তারা বেশ বড় এবং বেশ শক্তিশালী, তাছাড়া সংখ্যায় ওরা ৫ জন আর অন্যদিকে কেবল একাই আমি।

উঁহু! আর যাই হোক, ওদের সাথে অন্ততপক্ষে মারামারি করার ঝুঁকি নেওয়া চলে না, বাস্তব জীবনে এটা একটা চরম নির্বুদ্ধিতা হবে তা হলফ করেই বলা যায়।

 

ঠিক সেই মুহূর্তেই একটা মিরাকল ঘটলো, আমার ফুফাতো ভাই ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে গেলো অলৌকিকভাবে।

ও আমার সমবয়সী প্রায়, বছর দেড়েকের বড় হবে মাত্র, তবে প্রবলরকম একগুঁয়ে আর রগচটা স্বভাবের, সব শুনেই পুরাদস্তুর লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়ে দিলো।

 

অজস্র বাক্যব্যয়ের মাঝে আকস্মিক ওদের কেউ একজন বলে উঠলো- “যদি মায়ের দুধ খেয়ে থাকিস তবে মেলা থেকে বের হ, দেখাচ্ছি তোদের…।”

কী..!! এত বড় কথার পরেও উচিৎ অনুচিত বিবেচনা করে নমনীয়তা দেখানো কাপুরুষতা ভেবে শরীরের রক্ত সর্বচ্চ স্ফুটনাঙ্কে ফুটতে শুরু করেছে ইতিমধ্যে, আমরা তৎক্ষণাৎ মেলার বাহিরে আসলাম।

 

কিছুটা নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়াতেই ওরা পাঁচ জন আমাদের দুজনকে চারদিক থেকে ঘিরে বৃত্ত বানিয়ে দাঁড়িয়েছে, ওদের চোখ আর দেহভঙ্গি দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম এক্ষণি আক্রমণের শিকার হচ্ছি আমরা, এতে যেন বিন্দুসমও ভুল ছিল না।

একটি মুহূর্তও অপচয় না করে শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে তড়িৎগতিতে একটা জোরালো ঘুষি বসিয়ে দিলাম ঠিক নাক মুখ লক্ষ্য করে, আঘাতটা লেগেছিলো আমার প্রত্যাশার চেয়েও অধিক জোরে।

কেউ কিছু বুঝে উঠার পূর্বেই একটা বিশ্রী চিৎকার করে ছেলেটি মাটিতে লুটিয়ে পড়লো, ওদের বাকি চারজন পড়িমরি করে চার দিকেই দিল ভোঁদৌড়।

যে মাটিতে পড়ে আছে সে ঝটকা মেরে উঠে দাঁড়ালো পরমুহূর্তেই, এক হাতে নাক মুখ চেপে রুদ্ধশ্বাসে দৌড় দিলো মেইন রাস্তাকে উদ্দেশ্য করে, আমরা দুজনও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নই, অন্তত এই পরিস্থিতে।

পেছন পেছন আমরাও ছুটলাম সাধ্যমত, ওকে ধরে আচ্ছামত ধোলাই না দিলে আমাদের রাগ কমবে না যেন!

 

যাইহোক,

ছেলেটি মেইন রাস্তায় উঠতে পারেনি শেষমেশ, রাস্তার পাশেই ধপাস করে সশব্দে মাটিতে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেলো।

নেড়েচেড়ে দেখলাম নিথর শরীরটা, নাকের ঠিক নিচের ঠোঁট ইঞ্চি দেড়েক কেটে ভেতরে ঢুকে গেছে, মনে হলো দুই একটা দাঁতও ভেঙেছে নির্ঘাত, প্রায় ফিনকী দিয়ে রক্ত বেরিয়ে ভিজে যাচ্ছিলো দূর্বাঘাস।

মরে টরে গেল না তো..!!

ভেবে দেখলাম এখানে আর থাকা চলে না, যারা পালিয়েছে তারা নিশ্চই অনেক লোক নিয়ে আসবে আমাদের প্রাপ্য উত্তম মধ্যম ও নিম্ন পুরস্কার দেওয়ার জন্য।

কাজিনকে বললাম “ভাগ এখান থেকে, আপাতত এই জায়গাটা ছেড়ে পালা…..”

 

ঘটনা-২

 

সবে প্রবাস জীবনের এক বৎসর অতিক্রম করেছে, সাদামাটা এই অনাড়ম্বর জীবনে আড়ম্বর বরাবরই অপছন্দের বিষয়। ঠিক এজন্যই শহুরে কোলাহল হতে পরিত্রাণ গ্রহণ এবং নির্বিঘ্ন নির্ঝঞ্ঝাট সময় কাটাতে  রাজধানী Kuyala Lampur থেকে কিছুটা দূরে  Petaling jaya নামক একটি আবাসিক এলাকায় চড়া দামে ছোট্ট একটি বাসা ভাড়া নিয়েছিলাম।

বাসা থেকে কিছুটা সহনীয় দূরত্বে বহুতলাবিশিষ্ট  Jaya-1 শপিং কমপ্লেক্স, ফার্স্ট ফ্লোরে “White Coffee House” ক্যাফে, হালকা আলো-আঁধারিতে খানিক ভূতুড়ে  ভূতুড়ে পরিবেশটা সত্যিই ঠিক অন্যরকম, ভালোলাগাটা এক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক হয়ে যায়।

 

যাইহোক,

প্রত্যহ বিকালে এই ক্যাফেটাতেই বসি, কফির পেয়ালায় চুমুক দিয়ে কিছুটা সময় পোড়াই…।

ক্যাফের ঠিক পূর্ব পাশের রাস্তার বিপরীতে একটি কনসট্রাকশন ফার্ম, শুনেছি ওটা তেতলা হাসপাতাল হবে।

সেদিন সন্ধ্যার ক্ষণকাল পূর্বের ঘটনা, মাত্র কফি শেষ করে উঠবো বলে মনস্থির করেছি ঠিক তখনই আকস্মিক অনেক লোকের সমস্বরে উদ্ধত চিৎকার শুনে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে এলাম।

দেখলাম নির্মাণাধীন হাসপাতালের কর্মীদের মাঝে গ্যাঞ্জাম লেগেছে, স্বভাবতই কৌতূহলী হয়ে খোলা গেইটের সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ালাম।

বুঝলাম ঘটনাটা, ইন্দোনেশিয়ান কর্মীদের সাথে বাঙালি কর্মীদের আক্রমণাত্মক ঝামেলা চলছে, মনে হলো ইন্দোনেশিয়ান কর্মী সংখ্যায় ৭/৮ জন হবে, বাঙালি কর্মী প্রায় ২৫/৩০ জন, অর্থাৎ বাঙালি কর্মীরা দলে অনেক ভারি..।

 

কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই মারামারি শুরু হয়ে গেলো, লৌহ রড, কাঠ খুটি, হাতুড়ি হাতের কাছে যে যা পেয়েছে তাই নিয়েই হামলা-পালটা হামলা চলছে।

অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, মারামারি শুরু হবার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বাঙালিরা সব উধাও…!

পড়িমরি করে প্রত্যেকেই পালিয়েছে প্রাণ বাঁচিয়ে….!

অথচ ভেবেছিলাম ইন্দোনেশিয়ান কর্মীরা চরম মাইর খাবে, সংখ্যা সেটাই বলে, অগত্যা ২৫/৩০ জন কর্মী কম কথা নয়…।

 

যাইহোক,

শেষমেশ দুইজন বাঙালি পালাতে পারেনি কিংবা পালাতে চায়নি বলেই তারা ধরা খেয়ে প্রচুর ধোলাই খেয়েছিলো ইন্দোনেশিয়ানদের হাতে….।।

 

→ কিছু কথাঃ- দুইটি গল্পের  মূল ভাব হচ্ছে আমাদের নির্বুদ্ধিতা ও অনৈক্য, এই অনৈক্যর জন্যই আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও ভীষণ দুর্বল আর এজন্যই আমরা বাঙালিরা সর্ব ক্ষেত্রেই শোষিত হয়ে আসছি…।

মুসলিমদের মাঝেও আজ ঐক্য নেই, নেই স্বার্থহীনতা, তাই আমরা সংখ্যায় অধিক হলেও ক্ষমতাধর বিশ্বের কাছে অত্যন্ত দুর্বলের ন্যায় আজো অবহেলিত, বঞ্চিত আর শোষিত।

 

ভেবে দেখুন,

প্রথম ঘটনায় আমরা মাত্র ২জন, আর ওরা পাঁচ জন।

ওদের মধ্যে যদি প্রকৃত একতা থাকতো তবে আমাদের দু’জনকেই ভর্তা বানিয়ে ফেলতে পারতো।

পক্ষান্তরে, ২য় ঘটনায় ২৫/৩০ জন বাঙালি কর্মীদের মাঝেও যদি প্রকৃত ঐক্য থাকতো তবে ৭/৮ জন ইন্দোনেশিয়ান কর্মীকেও ভর্তা বানিয়ে দিতে পারতো….।

 

পরিশেষে এটাই বলতে চাই, ১৯৭১ এর মতো ঐক্য বাঙালিদের জীবনে আর আসবে না, দিনে দিনে সভ্যতা নামধারী অসভ্যতার ষড়যন্ত্রে আমরা কেবল অনৈক্যতায় নিজেদেরকেই দুর্বল করে অন্যান্য জাতির নিকট শোষিত হচ্ছি…..

পোষ্টটি আপনার বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন !
Share on Facebook
Facebook
0Pin on Pinterest
Pinterest
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin

Leave a Reply